এমনটি ঘটবে, তা অনেক দিন থেকেই শোনা যাচ্ছিল। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিবারের বিপরীতে এসেছে আরেকটি সংগঠন। নাম ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ফোরাম’। গত কয়েক মাসে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিবারের একের পর এক আপত্তিকর সিদ্ধান্ত চলচ্চিত্রে কাজের পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তোলে। বন্ধ হয়ে যায় নতুন ছবির কাজ। ব্যক্তিগত রেষারেষির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় চলচ্চিত্রশিল্প। শাকিব খানকে নিয়ে এবং তাঁর সঙ্গে কোনো কাজ না করার জন্য সবাইকে আহ্বান জানানো হয়। দেশের এই শীর্ষ চিত্রনায়ককে ঘিরে যে প্রযোজক ও পরিচালকেরা কাজের পরিকল্পনা করছিলেন, হাত গুটিয়ে বসে থাকেন তাঁরা। যাঁরা কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তাঁরা মামলার মুখোমুখি হন। যে শিল্পী ও কলাকুশলীরা শাকিব খান অভিনীত ছবিতে কাজ করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট সংগঠন ব্যবস্থা নেয়। সব মিলিয়ে চলচ্চিত্রের শুটিং প্রায় থেমেই যায়। সেই অবস্থা থেকে চলচ্চিত্রকে রক্ষা করতে নতুন একটি সংগঠন গঠন করা হলো।
আজ সোমবার দুপুরে ঢাকা ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে চলচ্চিত্রের শিল্পী আর কলাকুশলীদের নিয়ে নতুন সংগঠন ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ফোরাম’-এর নাম ঘোষণা হয়। নতুন এই সংগঠনের সভাপতি প্রযোজক নাসির উদ্দিন দিলু আর সাধারণ সম্পাদক পরিচালক কাজী হায়াৎ।
সংগঠনটির কার্যকরী নির্বাহী পরিষদের অন্যরা হলেন সহসভাপতি হল মালিক মোহাম্মদ হোসেন, পরিচালক ও অভিনয়শিল্পী নাদের চৌধুরী, প্রযোজক ও অভিনয়শিল্পী ড্যানি সিডাক, হল মালিক নাদের খান এবং প্রযোজক সেলিম খান। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হল মালিক কামাল মোহাম্মদ কিবরিয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক প্রযোজক এম ডি ইকবাল, সহসাংগঠনিক সম্পাদক প্রযোজক ও অভিনয়শিল্পী মো. রমিজ উদ্দিন, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া সম্পাদক ফারহান আমিন নূতন, আন্তর্জাতিক সম্পাদক চিত্রনায়িকা আরিফা পারভীন জামান মৌসুমী, দপ্তর সম্পাদক পরিচালক ও প্রযোজক জাহিদ হোসেন, কোষাধ্যক্ষ অভিনয়শিল্পী কামরুজ্জামান কমল।
সদস্যরা হলেন প্রযোজক আবদুল আজিজ, চিত্রনায়ক ওমর সানি, চিত্রনায়ক অমিত হাসান, চিত্রনায়ক কাজী মারুফ, অভিনয়শিল্পী নানা শাহ তারিক, অভিনয়শিল্পী শিবা শানু, চিত্রনায়িকা বিদ্যা সিনহা মিম, চিত্রনায়িকা ববি, চিত্রনায়িকা শবনম বুবলী, অভিনয়শিল্পী ডি জে সোহেল, অভিনয়শিল্পী হাফিজুর রহমান সুরুজ, বাংলাদেশ দর্শক সমিতির বড়ুয়া মনোজিত ধীমান, বুকিং এজেন্ট সিরাজুল ইসলাম, বুকিং এজেন্ট অজিত নন্দী এবং চিত্রনায়ক শাকিব খান।
কাজী হায়াৎ বললেন, ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যখন ৩৫ মিমি থেকে ডিজিটালে উন্নীত হয়েছে, তখন থেকে একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ডিজিটাল মিডিয়ায় আসার পথে মাঝেমধ্যে হোঁচট খাচ্ছে আমাদের চলচ্চিত্র। আমাদের দেশের অধিকাংশ পরিচালক, প্রযোজক, প্রদর্শক এই ডিজিটাল মিডিয়ার সঙ্গে পরিচিত নন। তাই না বুঝে তাঁরা অনেক উদ্ভট কথা বলে ফেলেন। আমাদের এই ফোরামের প্রধান উদ্দেশ্য চলচ্চিত্রের সমস্যা থেকে উত্তরণ ও চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য এ সংগঠনের জন্ম।’
কাজী হায়াৎ আরও বলেন, ‘আমাদের এই সংগঠন থেকে চলচ্চিত্রের নানা সংকট নিয়ে বছরে একটি করে সেমিনার করব। এসব সেমিনার থেকে উঠে আসবে আমাদের কী কী দুর্বলতা আছে, তা বের করা এবং সম্ভাবনার রাস্তা খুঁজে বের করা। অনেকেই হয়তো ভাবছেন, চলচ্চিত্রে এত সংগঠন থাকার পরও কেন আবার একটি সংগঠন তৈরি হলো? আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, চলচ্চিত্রের অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে আমাদের কারও কোনো বিরোধ নেই। আমরা চলচ্চিত্রের উন্নয়নে কাজ করব। আমাদের ছায়াতলে যাঁরাই আসবেন, তাঁদেরই আমরা স্বাগত জানাব।’
মৌসুমী বলেন, ‘শাকিব খান আমাদের বাংলা ছবির সুপারস্টার। দেশ ছাড়িয়ে সে কলকাতাতেও সুনাম কুড়াচ্ছে। আমাদের দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে। কিছুদিন আগে তাকে নিয়ে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। এরপর একদিন শাকিব প্রস্তাব দেয় নতুন একটি সংগঠন করার জন্য। মূলত শাকিবের প্রস্তাবেই চলচ্চিত্র ফোরামের যাত্রা আজ থেকে।’
মৌসুমী আরও বলেন, ‘চলচ্চিত্রকে বাঁচাতে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ফোরাম গঠন করা হয়েছে। এ সংগঠন কারও বিপক্ষে নয়, কাউকে ছোট করতেও নয়। যেসব বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল, তা রোধ করতে চলচ্চিত্র ফোরাম গঠিত হয়েছে। গোটা চলচ্চিত্রের ভালো কিছুর প্রত্যাশায় চলচ্চিত্র ফোরাম গঠন করা হয়েছে। এটা কারও একার স্বার্থ উদ্ধারের সংগঠন নয়। আমরা সবাই চলচ্চিত্রের উন্নতি চাই। চলচ্চিত্র বাঁচলে শিল্পীরা বাঁচবে, সিনেমা হল বাঁচবে। আমাদের মধ্যে আগামী দিনে আর কোনো দলাদলি হবে বলে আমি মনে করি না।’
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ফোরামের কার্যকরী নির্বাহী পরিষদঅনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সবাই মিলে যে সংগঠন (বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ফোরাম) গড়ে তুলেছেন, তার যত্ন নেবেন। বিশৃঙ্খলা করবেন না। মিলেমিশে কাজ করবেন। এটাই চাই। চলচ্চিত্রের সোনালি ইতিহাস ছিল। সেটাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। তার জন্য আপনাদের ভালো কাজ করতে হবে।’
সিনেমার জনপ্রিয় নায়ক শাকিব খান বলেন, ‘ইদানীং আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যান (বহিষ্কার) একটি কালচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেটা আমি অনেক বছর দেখিনি। কথা বললেই, পা ফেললেই ব্যান। কিছু বললেই ব্যান! আসুন, আমরা ব্যান কালচার বাদ দিয়ে চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাই।’
শাকিব আরও বলেন, ‘আমাদের এই ফোরামের সঙ্গে তাঁরাই আছেন, যাঁরা নিয়মিত কাজ করছেন। এ সংগঠনের সবার স্বার্থ রক্ষিত হবে। আমাদের এখানে ভালো ছবি হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। আমাদের এখানে ভালো ছবি কিন্তু নির্মিত হচ্ছে। “আয়নাবাজি” যার উদাহরণ। আরও ভালো ছবি নির্মিত হচ্ছে। কিন্তু কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। এ সমস্যা দূর করতে হবে আমাদের। এসব সমস্যা নিয়ে কাজ করবে চলচ্চিত্র ফোরাম।’
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ফোরাম সমাজসেবা অধিদপ্তরে নিবন্ধন করা হয়েছে। নিবন্ধন নম্বর ঢ-০৯৪৯৮।






