রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বর গণহত্যা ও নির্যাতন অব্যাহত থাকায় পশ্চিমাবিশ্ব দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞার পথেই এগোচ্ছে। তবে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওপর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা কারো জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে মিয়ানমার। দেশটির পরিকল্পনা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব ইউ টুন টুন নাইং এ হুঁশিয়ারি দেন। রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে এর আগে মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে দেয়া প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাতিল করে দেয় যুক্তরাজ্য।
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে ইইউ রাষ্ট্রদূত কর্তৃক অনুমোদিত সমঝোতাপত্রটি আগামী সোমবার পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠকে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। সমঝোতাপত্রে উল্লেখ করা হয়, এত দ্রুত একটি গোষ্ঠী এক দেশ থেকে অন্য দেশে শরণার্থী হয়ে পালিয়ে যাওয়া নির্দেশ করে যে, মিয়ানমার সংখ্যালঘুদের বহিষ্কার করার জন্য ইচ্ছাকৃত এমন পদক্ষেপ নিয়েছে। ইইউ বর্তমানে নিপীড়নের জন্য মিয়ানমার ব্যবহার করতে পারে এমন অস্ত্র এবং সরঞ্জাম রফতানি নিষিদ্ধ করেছে। ইইউ দফতর থেকে আরো বলা হয়, চলমান সংকটের অবনতি হলে কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত ব্যবস্থা বিবেচনা করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও রোহিঙ্গা গণহত্যার দায়ে মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞার দাবি তোলা হয়। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি নিকি হ্যালি সম্প্রতি মিয়ানমারের ওপর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, রাখাইন পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কী পরিণতি অপেক্ষা করছে তা চিন্তাও করতে পারবে না মিয়ানমার।
এদিকে রাখাইন রাজ্যে অব্যাহত গণহত্যা ও সহিংসতার মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ রোহিঙ্গা ইস্যুতে কফি আনান কমিশনের প্রতিবেদনের ওপর শুনানি করতে অনানুষ্ঠানিক এক বৈঠকে বসছে। আজ শুক্রবার এই বৈঠক হবে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সেপ্টেম্বরের পর এটি নিরাপত্তা পরিষদের দ্বিতীয় বৈঠক। জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা জেফ্রি ফেল্টম্যান রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা করতে চারদিনের জন্য আজ মিয়ানমার সফরে যাচ্ছেন। জাতিসংঘ বলছে, জাতিগত নিধন চালাচ্ছে মিয়ানমার। তারা এও বলেছে, রোহিঙ্গাদের পুরোপুরি বিতাড়িত করতেই অভিযান চালাচ্ছে দেশটি। এ বিষয়ে জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা বলেন, জেফ্রি সংকট নিয়ে কথা বলবেন।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ২৯ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বৈঠক হয়। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ সাতটি দেশ এই বৈঠকের আবেদন করে। বৈঠকে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের বক্তব্য শুনেছেন নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা। জবাবে চীন ও রাশিয়া তা উড়িয়ে দিয়ে মিয়ানমারেরই পক্ষ নেয়। কার্যত কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয় আলোচনা।
মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর মানবকণ্ঠকে জানান, রোহিঙ্গাদের নিয়ে মিয়ানমার যে অন্যায় করেছে, তাতে নিষেধাজ্ঞা হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের নীতিগতভাবে দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞার পক্ষে ঠিকই, কিন্তু সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞা কতটা জোরালো হবে তা নিয়ে সন্দেহ থাকবে। কারণ, চীন ও রাশিয়া মিয়ানমারকে সমর্থন অব্যাহত রাখলে নিষেধাজ্ঞায় খুব বেশি প্রভাব নাও পড়তে পারে। তবে উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে চীন আন্তর্জাতিক চাপে থাকায় মিয়ানমারের ওপর সমর্থন কিছুটা হালকা হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
ওদিকে পশ্চিমাবিশ্বের নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতিতে মিয়ানমার সরকার কিছুটা শঙ্কিত বলে জানিয়েছে মিয়ানমার টাইমস। মিয়ানমারে যদি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় তাহলে গত কয়েক বছরের উন্নয়নের পর দেশটির বর্তমান অর্থনীতিকে পেছনের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে মনে করছে মিয়ানমার টাইমস। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। এটা ভালো কোনো লক্ষণ নয়। মিয়ানমারের এক শীর্ষ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে মিয়ানমার টাইমস জানিয়েছে, এটি দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
দেশটির ক্ষমতাসীন এনএলডির অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ইউ ইয়ে মিন ওও বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও অনৈক্য দেখা দিতে পারে। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে মিয়ানমারের অর্থনীতিতে তা সীমিত প্রভাব ফেলতে পারে। নিষেধাজ্ঞার কারণে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ব্যবসা বাণিজ্যের ওপর। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিয়ানমারের ব্যবসা-বাণিজ্য সীমিত। চীন, জাপান, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের তুলনায় ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য কম হওয়ায় নিষেধাজ্ঞা মিয়ানমারের অর্থনীতির ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারবে না।
এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করে রাখাইনে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও গভীর সমুদ্র বন্দরে বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিয়েছে মিয়ানমার সরকার। এর ফলে রাখাইনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নাটকীয় প্রভাব ফেলবে এটি। সেখানে নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নে কয়েক বিলিয়ন কিয়াট প্রকল্পের উদ্বোধন করেছে। ১৮ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় রাখাইনের ‘দ্য মেইয়ু মাউন্টেইন রেঞ্জ প্রজেক্ট’ শিগগিরই উদ্বোধন করা হবে বলে ঘোষণা দেয়। এই প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে ২৭৩ কিলোমিটার সীমান্তে মেরামত এবং নতুন করে বেড়া নির্মাণ। তবে ইতিমধ্যে ২১০ কিলোমিটার সীমান্ত বেড়া নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত স্কট মারসিয়েলের সঙ্গে বুধবার এক বৈঠকে মিয়ানামারের সেনাবাহিনীর প্রধান মিন অং হ্লাইং রোহিঙ্গা মুসলিমরা মিয়ানমারের স্থানীয় বাসিন্দা নন বলে দাবি করেছেন। বৈঠকে হ্লাইং উত্তর রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর তার বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ সম্পর্কে কিছু বলেননি এবং বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বাড়িয়ে বলার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা আছে বলে অভিযোগ করেন। বৈঠকে রোহিঙ্গাদের বাঙালি বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাঙালিদের এই দেশে মিয়ানমার নিয়ে আসেনি, উপনিবেশবাদীরা নিয়ে এসেছিল। বাঙালিদের সত্যিকারের জায়গা বাংলা। সেখানে নিরাপদে থাকতে পারবে এ ধারণা থেকেই সম্ভবত সেখানে পালিয়েছে বলে মন্তব্য করেন দেশটির সেনাপ্রধান।






