রাজধানীবাসীর মেট্রোরেলের স্বপ্ন বাস্তবায়নে শুরু হয়েছে কর্মযজ্ঞ। রাতদিন অবিরাম চলছে পরীক্ষামূলক পাইলিং (মাটির অনেক গভীর ভিত্তি স্থাপন) ও স্যান্ড কম্পাকশন পাইলিং (মাটির গভীরে বিশেষ প্রক্রিয়ায় বালু ভরাট)। সেই সঙ্গে বেশ জোরেশোরেই চলছে ডিপো ও স্টেশন নির্মাণের কাজও। সম্প্রতি উত্তরা, মিরপুর ও আগারগাঁও ঘুরে দেখা গেছে এ চিত্র।
সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে থাকা (ফাস্ট ট্রাক) প্রকল্প হওয়ায় এর কার্যক্রম সরাসরি তদারক করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রকৌশলী, কর্মী ও শ্রমিকরা তা বাস্তবায়নে অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। গত বছর গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলায় এ প্রকল্পের ছয় জাপানি প্রকৌশলী নিহত হওয়ার পর যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল, সবার প্রচেষ্টায় কেটে গেছে সেটিও। ফলে প্রাণ ফিরে পেয়েছে মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ।
জানতে চাইলে ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (মেট্রোরেল) সাবেক প্রকল্প পরিচালক এবং বর্তমানে রেল সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন যুগান্তরকে জানান, প্রকল্পটি ২০২৪ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু আমরা চ্যালেঞ্জ নিয়েছি ২০১৯ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের। সেভাবেই কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছিল। কিন্তু হলি আর্টিজানে হামলায় ছয় জাপানি প্রকৌশলী নিহত হওয়ায় কাজ মারাত্মক বাধাগ্রস্ত হয়। পরে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলাপ-আলোচনা এবং যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই বিদেশিদের প্রকল্পে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
মোফাজ্জেল হোসেন আরও বলেন, মিরপুর থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ইউটিলিটি (বিদু্যুৎ, গ্যাস ও পানির লাইন) স্থানান্তরের কাজ শেষ। নভেম্বরে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ শুরু হবে। এ কাজটি বেশ চ্যালেঞ্জিং। কেননা এটি মূল সড়ক। তবে যাতে মানুষের কষ্ট কম হয়, এজন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা থাকবে। কাজ চলার সময় মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের মতো জনদুর্ভোগ হবে না।
সূত্র জানায়, জনদুর্ভোগ কমাতে মূল কাজ শুরু হলে রাস্তার দু’দিকে দুটি করে চারটি লেন খোলা রাখা হবে। মাঝে মিডিয়ান ঘিরে কাজ চলবে। পাইলের বোরিং (খনন) করার সময় যেসব মাটি উঠবে সেগুলো বক্সে তুলে উত্তরায় একটি ডাম্পিং সাইটে ফেলা হবে। এরই মধ্যে এজন্য একটি নিচু এলাকা নেয়া হয়েছে। তাছাড়া ধুলো যাতে না হয়, সেজন্য পানি ছিটানোর ব্যবস্থা থাকবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরা থেকে মতিঝিল মাত্র ৩৭ মিনিটে যাওয়া যাবে। বর্তমান বাস্তবতায় ঢাকাবাসীর কাছে এটা অলীক স্বপ্ন। কিন্তু ধীরে ধীরে তা এগিয়ে যাচ্ছে বাস্তবায়নের দিকে। বিদ্যুৎচালিত এ রেলে প্রতি ঘণ্টায় উভয় দিকে ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা থাকবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেট্রোরেল তৈরির মধ্য দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিশ্বমানে উন্নীত হওয়ায় ঢাকার যানজটও কমে যাবে। এ ট্রেনের গতি হবে ঘণ্টায় গড়ে ৩২ কিলোমিটার (সর্বোচ্চ ১শ’ কিলোমিটার)। এ রুটে চলাচল করবে ১৪টি ট্রেন। প্রতিটিতে ৬টি করে বগি থাকবে। প্রতি ট্রেনে ৯৪২ জন যাত্রী বসে এবং ৭৫৪ জন দাঁড়িয়ে যাতায়াত করতে পারবে। প্রতি ৪ মিনিট পর ট্রেন ছেড়ে যাবে।
উত্তরায় গিয়ে দেখা যায়, বিশাল নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে ২২ হেক্টর জমিতে চলছে ডিপো নির্মাণের কর্মষজ্ঞ। দেশি-বিদেশি আড়াইশ’ কর্মী-শ্রমিকের কাজের শব্দে মুখর এলাকা। যে যার দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত। এখানে এখন সয়েল ইমপ্র“ভমেন্টের (মাটি উন্নয়ন) কাজ চলছে। মাটির ২০-২২ মিটার গভীর পর্যন্ত জাপানি প্রযুক্তির সাহায্যে সিলেটের বালু দিয়ে কম্পাকশন (চাপ দিয়ে সংকোচন) করা হচ্ছে। এ অংশের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রজেক্ট ম্যানেজার মো. শাহজাহান যুগান্তরকে বলেন, ডিপো নির্মাণের কাজ চলছে রাতদিন শিফট করে। এখানে কর্মীদের জন্য তিন স্তরের নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে। আশা করছি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
আগারগাঁওয়ে গিয়ে দেখা গেছে, পরিসংখ্যান ভবনের সামনের রাস্তা ঘিরে ফেলে চলছে কর্মযজ্ঞ। সেখানে এরই মধ্যে টেস্ট পাইলের কাজ শেষ হয়েছে। এখন রিপোর্ট পাওয়ার অপেক্ষা। প্রকৌশলীরা জানান, এখানে কন্ট্রোল রুম, সাইট অফিস, বেসিন প্লান্ট বসানোর কাজ চলছে। উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ৯ স্থানে টেস্ট পাইলের কাজ চলছে। এগুলোর মধ্যে ৪টি করে অ্যাংকর এবং একটি করে পাঁচটি পাইলট পাইল হবে। টেস্ট পাইলের পরই স্টেশনগুলোয় ফেন্সিং (ঘিরে ফেলে) করে শুরু হবে মূল পাইলিংয়ের কাজ।
প্রকৌশলীরা আরও জানান, আগারগাঁও মোড়ে তৈরি হবে স্টেশন। এখানেও টেস্ট পাইলিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, রিগ মেশিনে গর্ত খোঁড়া হচ্ছে। লোহার খাঁচা তৈরি। কর্মচারীরা জানান, শ্রমিকদের আবাসনের ব্যবস্থাও থাকবে এখানে।
মিরপুর সাড়ে ১১ নম্বরে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার মিডিয়ান বরাবর ফেন্সিং করা হয়েছে। এখানে কাজ করছেন শ্রমিক ও প্রকৌশলীরা। তারা জানান, টেস্ট পইলিং ও লোড টেস্টের কাজ প্রায় শেষ। এ স্থানে সার্ভিস পাইলের (মূল পাইলিং) কাজ শুরু হবে। কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দু’এক দিনের মধ্যেই যন্ত্রপাতি আসবে এ স্থানে। তারপরই শুরু হবে পাইলিং কার্যক্রম। এ লক্ষ্যেই প্রাথমিক কার্যক্রমগুলো শেষ করছেন তারা।
সূত্র জানায়, ২০০৮ সাল থেকে মেট্রোরেলের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। মেট্রোরেল-৬ এর রুট উত্তরা তৃতীয় পর্যায় থেকে শুরু হয়ে মতিঝিল শাপলা চত্বর পর্যন্ত। কিন্তু প্রথম পর্যায়ে ২০১৯ সালের মধ্যে আগারগাঁও পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার বাণিজ্যিক চলাচল শুরু হবে। গত বছরের ২৬ জুন প্রথম অংশের কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্য দিয়ে প্রকল্পের কাজ নতুন গতি পায়। ২০২০ সালের মধ্যে বাকি অংশের (মতিঝিল পর্যন্ত) কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। পুরো ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে মেট্রোরেল বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৬শ’ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। বাকি ৫ হাজার ৪শ’ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হচ্ছে।
ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী শুরু থেকে গত জুন পর্যন্ত মেট্রোরেলের প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এছাড়া কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ-১ এর বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৪৫ শতাংশ। কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ ২, ৩ ও ৪-এর ক্রয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে ৩ মে। কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ-৫ ও ৮ এর চুক্তির দরপত্রের কাজ চলছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রকল্পের অনুকূলে সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ১৮২ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এর মধ্যে অর্থবছর শেষে (গত জুন পর্যন্ত) ব্যয় হয় ১ হাজার ১৭৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা, যা আরএডিপি বরাদ্দের ৯৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ। মেট্রোরেলের পুরো কাজ ৮টি প্যাকেজে বাস্তবায়ন করা হবে।
সূত্র জানায়, মেট্রোরেলের রুটে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মোট ১৬টি স্টেশন থাকবে। এর মধ্যে প্রথম পর্যায় উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত থাকবে ৯টি স্টেশন। এগুলো হচ্ছে- উত্তরা নর্থ, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা সাউথ, পল্লবী, মিরপুর সাড়ে ১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া এবং আগারগাঁও। দ্বিতীয় পর্যায়ে মতিঝিল পর্যন্ত থাকবে ৭টি স্টেশন। এগুলো হচ্ছে বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (টিএসসি), সচিবালয় ও শাপলা চত্বর।






